নজর দোষ কি ও তার থেকে বাচার উপায় । Nazar Dosh Door Karne Ka Upaye - Astro Luck

Breaking

March 7, 2020

নজর দোষ কি ও তার থেকে বাচার উপায় । Nazar Dosh Door Karne Ka Upaye


আমরা ছোটবেলায় সকলেরই শুনেছি মা ঠাকুর মুখে - "আয় আয় চাঁদমামা, টিপ দিয়ে যা খোকন সোনার কপালে টিপ দিয়ে যা"। চঁদমামা টিপ দিকে বা না দিক, কিছুদিন আগে পর্যন্ত ঘরে ঘরে মায়েরা তাদের সন্তানের কপালে একটা করে কাজলের টিপ লাগিয়ে দিতো যাতে শিশুর উপরে কোনো খারাপ নজর না পড়ে। রাস্তা ঘাটে মাঝে মধ্যে এখন দেখা যায় যে ট্রাক কিংবা বাসের পিছনে লেখা থাকে "বুরী নজর বালে তেরা মুহূ কালা"। আবার অনেকে নতুন বাড়িতে লেবু ও লঙ্কা বা ঝাটা ও ঝুড়ি ঝুলিয়ে রাখে। আবার অনেকে গৃহের প্রধান দরজার উপরে সিংহের মতো দেখতে এক ধারণের রাক্ষস রুপি একটি মুখোশ ঝোলানো থাকে। আবার কেউ কেউ কালো কাপড় বা কালো রুমালকে বাজে নজর বা বাজে দৃষ্টি কাটানোর একটি উপায় হিসাবে ব্যবহার করে থাকেন। আবার কেউ ছেঁড়া ফাটা জুতো গাড়ির পিছনে ঝোলায় তারাও নজর দোষ কাটানোর জন্যই করে থাকে।  মানব সমাজে অধিকাংশ ব্যক্তি মনে করে যে তার কোনো মানুষ বা কোনো প্রাণীর কুদৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্যে বিশেষ কোনো সুরক্ষা পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত। এই নজর লাগা, দৃষ্টি দোষ প্রভৃতির ভয় মানুষের মধ্যে চিরকাল আছে ও থাকবে। এবারে চলুন একটু বিস্তারিত ভাবে জেনে নেয়া যাক।


নজর দোষ অথবা দৃষ্টি দোষ কি :

এই জগতে প্রতি মুহূর্তেই আমরা অনুভব করি যে চারপাশে ছড়ানো স্থূল বস্তু অপেক্ষায় সূক্ষ্ম বস্তুর শক্তি অনেক বেশী। মানুষ যে চিন্তা করে, মানুষের শারীরিক শক্তির থেকে সেই চিন্তাশক্তি অনেক বেশী প্রবল। মানুষের ইচ্ছাশক্তি সম্ভবত প্রবলতম। জীবেরা যে বিচার করে সেই বিচারশক্তির তরঙ্গ যদিও আমাদের দৃষ্টি অথবা স্পর্শগোচর হয় না কিন্তু বস্তুজগতের উপর এর প্রভাব অপরিসীম। জড় থেকে চেতন পর্যন্ত জীবের এই চিন্তাশক্তি বা বিচারশক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়। বিচারের সাথে সাথে মানুষ অথবা মানুষ্যতর প্রাণী ( কুকুর ) যখন চক্ষু অথবা নাসিকা দিয়ে তাদের কামনার বিষয়বস্তু গ্রহণ করে তখন তাদের মন খুব একাগ্র হয়ে যায়। ওই একাগ্রতার মধ্যে দিয়ে জীবের কামনা - বাসনার সূক্ষ্ম ক্ষরণ অথবা পরিবর্তন শুরু হয়ে যায়। এর প্রভাব যেকোনো অর্থেই চরম ক্ষতিকর পর্যন্ত হতে পারে।
কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক।

১) ধারাজক কোনো সন্তানহীন দম্পতি অনেক বয়স পর্যন্ত কোনো সন্তান লাভ করেনি। এরা যদি অন্য কোনো দম্পতির কোনো সুন্দর ,মিষ্টি শিশু দেখে তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মধ্যে কোনো বেদনাবিধুর ঈর্ষা অথবা সন্তানের অভিলাষজনিত উদ্বেগ বা কষ্ট হতে পারে। এর ফলে ওই দম্পতির দৃষ্টির সাথে শিশু অভিলাষ জনিত কামনা শক্তি তরঙ্গ মিশে এতো উগ্রশক্তির বৃষ্টি হয় যে তাদের নজর ওই শিশুটির পক্ষে অশুভ হয়ে থাকে।  এরফলে শিশুটির কোনো অসুখ বা দুর্ঘটনা হতে পারে। কোনো উত্তল লেন্সের মধ্যে দিয়ে সূর্যরশ্মি ঢুকে যেমন একত্রীভূত হয়, এই ক্ষেত্রেও তেমন মানবমনের অন্তর্নিহিত চাহিদাশক্তি কেন্দ্রীভূত হয়ে একটি বিশেষ শক্তি তরঙ্গের সৃষ্টি করে। এই চাহিদা যদি অন্যায্য হয় তবে তা অন্য বস্তুর উপর অশুভ প্রভাব সৃষ্টি করে।      

২) এইরকমভাবে, ধরুন, যখন আপনি ভোজন করছেন তখন যদি কেউ আপনার বাবার খাবারের প্রতি লোভাতুর দৃষ্টি দেয়  তখন সেই খাদ্যদ্রব্য দূষিত হয়ে পরে। এরখম প্রায়ই দেখাযায় যে, রাস্তার পশে কোনো রেস্তোরায় অথবা খাবারের স্টলে দাঁড়িয়ে আপনি খাচ্ছেন আর কোনো হত-দরিদ্রু ভিখিরি অথবা রাস্তার কুকুর একদৃষ্টিতে আপনার খাদ্যদ্রব্যের দিকে লোলুপ, ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এই ক্ষেত্রে তাদের কেন্দ্রিভুত ইচ্ছা বা কামনার নজর দোষ আপনার খাবারের উপর পড়বে। এর ফলে আপনার শরীর খারাপ বা হজমের গণ্ডগোল হতে পারে। কখনো কখনো কোনো বিবাহ বা উৎসববাড়ির সব খাদ্যদ্রব্য এই দৃষ্টি দোষের কারণেই নষ্ট বা দূষিত হয়ে যায়। কুকুর, বিড়াল বা অন্য কোনো প্রাণীর দৃষ্টি থেকেও এই নজর দোষ লাগে।

৩) আজকাল বিবাহ বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে ফটোগ্রাফি বা ভিডিও রেকর্ডিং সকলেই করিয়ে থাকে শুভ মুহূর্ত কে একটি জায়গায় ধরে রাখতে। নব দম্পতিকে দেখতে কেনাচায়। এখন ধরা যাক বেশি বয়স হয়েগেছে এমন কোনো অবিবাহিত ব্যক্তি বা মহিলা অথবা যাদের বিবাহিতজীবনে সুখপায়নি, এমন কেউ বিবাহে উপস্থিত থাকে বা ভিডিও ফুটেজ দেখে হয়তো তখন তাদের হৃদয়ে ঈর্ষার উৎপন্ন হতে পারে তার থেকেই তাদের তখনো বাজে দৃষ্টি নব দম্পতির উপর লাগতে পারে। এর ফলে হয়তো তাদের নতুন দাম্পত্য জীবন সুখের হলোনা বা দাম্পত্য জীবন শুরু হবার আগেই কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলো ইত্যাদি।

নজর কাদের লাগে :

নজর দোষ নিচু স্তরের মানুষের থেকে পশু পাখি অথবা মানুষের ব্যবহৃত সম্পত্তি হতে পারে। গাছপালা অথবা দ্রব্যের উপরে নজর দোষ লাগতে পারে।

নারী - পুরুষ অথবা শিশুদের উপরে নজর দোষ -
যে সব বালক - বালিকা সুন্দর, স্বাস্থ্যবান, বয়স অনুপাতে যাদের বুদ্ধি বেশি তাদের উপরে নজর দোষ বেশি লাগে। সঙ্গীত, নাটক, বিতর্ক, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান প্রভৃতি সামাজিক সম্মেলনের সময় এদের উপর বিশেষ করে নজর দোষ লেগে থাকে। সুন্দর, স্বাস্থ্যবান, তারুণ্যের অধিকারী ও আকর্ষনীয় নারী পুরুষের ক্ষেত্রে অধিক নজর দোষ লাগার সম্ভবনা থাকে। গায়ক, অভিনেতা, ভালো খেলোয়াড়, নায়ক বা নায়িকা, কবি ও উচ্চ পদস্থ কর্তা, তাদের মঞ্চে নিজের নিজের বিদ্যা প্রদর্শনের সময় তার উপরে নজর দোষ লেগে থাকে।

গৃহপালিত পশুর উপর নজর দোষ -
প্রায় সব ক্ষেত্রেই সুন্দর, স্বাস্থ্যবান, দৃষ্টি নন্দনদের উপরই নজর দোষ লাগে। গৃহপালিত পশুদের উপর নজর দোষ লাগলে পশুরা ক্রমশঃ দুর্বল এবং রোগা যুক্ত হয়ে পড়ে। যেসব পশু দুধ দেয়, তাদের দুধের পরিমাণ ক্রমশঃ কমে যায়। অনেক পশুর গা থেকে লোম ঝরে পড়ে। নজর দোষ লাগলে ঘোড়া কিংবা হাতির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। কুকুর বিড়ালতো নজর দোষের খুব স্বাভাবিক শিকার।

গৃহ-পালিত পাখিদের উপর নজর দোষ -
গৃহপালিত তোতা পাখি, ময়না পাখি, টিয়া প্রভৃতি পাখিদেরও নজর দোষ লাগে। নজর দোষ লাগলে পাখীরাও অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের ক্ষুধা তৃষ্ণা কমে যায় এবং বেদনায় ছটফট করে।

বস্তু সামগ্রীর উপর নজর দোষ -
ঘর বাড়ি দোকান কার্যালয় প্রভৃতির উপরেও নজর দোষ লাগতে পারে। এর ফলে গৃহ বাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং গৃহে বসবাসকারী ব্যক্তিদের উপরও এর কু প্রভাব পড়ে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কু-দৃষ্টি প্রভাব কি সবার উপরেই সমানভাবে পড়ে? অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে কু-দৃষ্টির প্রভাব সব মানুষ বা প্রাণীর উপর একইভাবে পড়ে না। মানুষ বা প্রাণীদের মধ্যে একটি স্বাভাবিক নজর প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে। এই প্রতিরোধ ক্ষমতার অনুপাতে নজর দোষের পরিণামও ব্যক্তি বা প্রাণীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন হয়। কোনো কোনো বিড়াল এমনও দেখা যায়, যাদের উপর নজর দোষের কোনো প্রভাবই পড়ছে না।

নজর দোষ প্রতিরোধক শক্তি কি :
মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে যেমন রোগ প্রতিরোধ শক্তি থাকে, মানুষের বা অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে তেমনই নজর প্রতিরোধক শক্তি বর্তমান। একই পুণ্য বলে। পূর্ব-জন্মের সৎকর্মের ফল স্বরূপ মানুষ যে পুণ্য অর্জন করে থাকে সেই পুণ্যের প্রভাবে মানুষ নজর দোষ থেকে রক্ষা পায়। পুণ্য যাদের কম, নজর দোষ তাদের পক্ষে অধিকমাত্রায় হানিকর হয়। এই জন্যে প্রত্যেক মানুষেরই শুভ কর্ম করে পুণ্য অর্জন করা উচিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় মানুষের এখন পুণ্য অর্জনের দিকে ঝোক অনেক কম।

নজর দোষ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় :
নিচে কিছু উপায় বা নিয়ম তুলে ধরা হোলো।
১) কখনো অন্যকে ঈর্ষা করা উচিত নয়। সাথে অপরের নামে অভিযোগ করা বা নিন্দা করাও অনুচিত।
২) দম্ভ করার ফলও খারাপ হয়। আত্ম প্রদর্শন করার মনোভাবের থেকেও নজর লাগে। এই জন্যে বিবাহ বা শুভ অনুষ্ঠানে বেশি ছবি তোলা বা বেশি ভিডিও করা উচিত না।
৩) গোমাতা, ব্রাহ্মণ, সাধু, কন্যা, বিবাহিত রমণী দের অপমান করবেন না।
৪) পুরুষরা নারীদের প্রতি ও নারী পুরুষদের প্রতি সব সময় সৎ ভাব বজায় রাখতে হবে।
৫) অতিরিক্ত আমিষ ভোজন, কুরুচিকর বিদেশী দ্রব্য এবং নাস্তিক মনোভাব বর্জন করুন।
৬) সর্বদা সৎসাহিত্য অধ্যয়ন করা ভালো।
৭) স্বীয় সন্তানদের সুশিক্ষা দেওয়া প্রতি মানুষেরই কর্তব্য। 
৮) যেকোনো অমাবশ্যায়  গাভী স্পর্শ করে এক চামচ করে গোমূত্র পান করলে নজর দোষ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। 

এছাড়াও নজর দোষের প্রভাব দূর করার জন্যে বহু মন্ত্র আছে। এই রকমই কিছু মন্ত্ৰ এবং তাদের পাঠ করার নিয়ম হলো - 
১) যদি ছোট বাচ্চা হঠাৎ করে রাতে ভয় পেয়ে জেগে যায় অথবা কাঁদতে শুরু করে তাহলে ঝাড়ুর একটা শলা বার করে সাতবার ঝাঁট দিয়ে সালাটিকে নিম্নলিখিত মন্ত্রটি পাঠা করতে করতে আগুনে ফেলে দিতে হবে। এতে বাঁচার ওপরে নজর দোষের কুপ্রভাব দূর হয়। 
মন্ত্র -
ওঁ ডায়ন মোর জাদুবন। চৌংক উঠে বালক কে প্রাণ। 
রোয়ে বালক বুক্কাফাড় । চীখে মার করে চীৎকার। 
দুহাই কামাখ্যা দেবী কো, তীহি শংকর কী আন। 
ওঁ নমো রুদ্রায়ং। ওঁ নমঃ কামাখ্যা দেবৈ হীং ক্রীং ফট্ স্বাহা।

২) মানুষ, প্রাণী, জীন জন্তু সবার নজর দোষ দূর করার জন্যে নিম্নলিখিত মন্ত্র পাঠা করতে করতে কিছু বিভূতি নিয়ে নজর দোষ পিরিতের গায়ে মাখাতে হবে। এই ভাবে তিনদিন করলে নজর দোষ দূর হয়েযায়। 
মন্ত্র -
ওঁ বিশ্বানি দৈব সবিতর্দুরিতালি পরাসুব।
যদ্ ভদ্রং তন্ন আসুব।। 


No comments:

Post a Comment